ইরানে কি শান্তি ফিরবে?
ইরান নিয়ে নানান রকম লেখা এই কয়দিন থেকে পড়ছিলাম। নানান ওয়েবসাইটে, নিউজলেটার আর আর্টিকেল, ভিডিও এনালাইসিস হরেকরকম মতামত। আমেরিকা আর ইজরায়েল ইরান হামলা করার পর থেকেই ইরানে থাকা ইরানীয় আর বিদেশে থাকা ইরানীয়দের নানান পোষ্ট পড়ছিলাম এক্সে (টুইটারে)।
দেশের বাইরে থাকা এই ইরানীয় ভদ্রলোকের এই পোষ্ট থ্রেডটা পড়লাম। মনে প্রশ্ন আসলো, আসলেই কি এখন ইরানে কোন পরিবর্তন আসবে? খামেনেই মারা গেছে, ইরান কি মুক্তি পেয়ে গেছে? এত সহজেই আমেরিকা ইরানে নিজেদের লোক বসায় ফেলতে পারবে?
উনার এই এক্সের পোষ্টের পুর্নাঙ বাংলা অনুবাদটা নিচে তুলে ধরলামঃ
খামেনেই মারা গেছেন। ভালো কথা।
কিন্তু ইরানে আমার পরিবার আছে। আমার বাবা এই মুহূর্তে সেখানেই আছেন। তাই আমি এখনই উল্লাস করছি না। কেন করছি না, তার কারণগুলো নিচে দিচ্ছি:
ইরান এই নির্দিষ্ট মুহূর্তটির জন্য বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘কন্টিনজেন্সি প্ল্যান’ বা আপদকালীন পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য চার স্তরের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা ঠিক করা আছে। আগে থেকেই অনুমোদন দিয়ে রাখা সামরিক হামলা, আর এমন আঞ্চলিক কমান্ডার—যাদের কাজ করার জন্য তেহরানের আদেশের অপেক্ষায় থাকতে হয় না।
আপনি যখন এটি পড়ছেন, ততক্ষণে নতুন একজন ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। আমরা শুধু এখনও তাঁর নাম জানি না।
এটি মাদুরোর (ভেনিজুয়েলা) মতো কোনো বিষয় নয়। সরকার উৎখাত হয়ে যায়নি; বরং সিস্টেমটি এই ধাক্কা সামলে নিয়েছে। এটি সেভাবেই তৈরি করা হয়েছিল।
যাবতীয় বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য একই কথা বলছে: খামেনেই-পরবর্তী ইরান নরম হওয়ার বদলে আরও কঠোর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেখানে রেভল্যুশনারি গার্ডের (IRGC) প্রভাব বাড়বে। পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হবে। এমনকি ইরানি জনগণের জন্য খামেনেইর আমলের চেয়েও খারাপ সময় আসতে পারে।
তাই এখনই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন না। পথ এখনো অনেক বাকি।
এখন কী হতে পারে?
আমার অনুমান হলো:
১. নতুন সর্বোচ্চ নেতার নাম ঘোষণা করা হবে (সম্ভবত তিনি ইতিমধ্যেই নির্বাচিত)। ২. তাঁকে দ্রুত হত্যা করা হবে। যে গোয়েন্দা তথ্যে খামেনেইর খোঁজ মিলেছে, তারা নতুন জনকেও খুঁজে বের করবে। ৩. পরবর্তী নেতা আত্মগোপনে চলে যাবেন। কে নেতৃত্বে আছেন তা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হবে। ৪. বিদেশি গোয়েন্দাদের হাতে যথেষ্ট তথ্যদাতা (moles) আছে, তাই তারা দ্রুতই আসল নেতাকে চিনে ফেলবে। ৫. আবারও গুপ্তহত্যা চলবে। ৬. এটি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকবে, যতক্ষণ না কেউ শর্ত মেনে নিতে রাজি হয়।
শর্তগুলো কী? পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা, মিসাইল প্রোগ্রাম বন্ধ করা এবং সবচেয়ে বড় বিষয়টি—যা নিয়ে কেউ কথা বলছে না—আইআরজিসি-কে (IRGC) পঙ্গু করে দেওয়া।
পুরো বিলুপ্ত করা নয়। আমরা ইরাক থেকে সেই শিক্ষা পেয়েছি। আপনি লাখ লাখ সশস্ত্র মানুষকে হুট করে বেকার করে দিতে পারেন না, যারা দেশের অর্থনীতির ২০-৪০% নিয়ন্ত্রণ করে। তাতে পরিস্থিতি আগের চেয়েও ভয়াবহ হয়।
বরং সংস্কার এবং নাম পরিবর্তন করা। তাদের পারমাণবিক শক্তি, মিসাইল, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য এবং প্রক্সি নেটওয়ার্ক কেড়ে নেওয়া। যা অবশিষ্ট থাকবে, তাকে একটি সাধারণ সামরিক বাহিনীর অধীনে নিয়ে আসা। এতে নতুন নেতৃত্ব অন্তত মান-সম্মান বাঁচানোর সুযোগ পাবে। তবে আমরা বর্তমানে যে আইআরজিসি-কে চিনি, তার অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে।
চূড়ান্ত পরিণতি: ধর্মতন্ত্রের প্রভাব কমবে। আপাতত শাসনব্যবস্থা একই থাকবে, কিন্তু কাঠামোগতভাবে তাদের দাঁত-নখ উপড়ে ফেলা হবে।
পাহলভী বংশের ফিরে আসার সম্ভাবনা আমার মতে সবচেয়ে কম।
এই সংকটের সমাধান তখনই হবে, যখন তেহরানের কেউ বুঝবে যে—আদর্শের চেয়ে বেঁচে থাকা বেশি জরুরি।
খামেনেইর মৃত্যুর পর যে নামগুলো আপনার জানা উচিত:
- আলি লারিজানি (Ali Larijani): যদি খামেনেই এই শাসনের প্রতীক হন, তবে লারিজানি ছিলেন এর মস্তিষ্ক। তিনি মাঠপর্যায়ে কাজ গুছিয়ে রাখতেন এবং খামেনেইর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছিলেন। এই শাসনব্যবস্থাকে যদি কেউ এখন টিকিয়ে রাখতে পারে, তবে তিনি এই লারিজানি। আমার ধারণা, তিনি এখন টার্গেট লিস্টের সবার উপরে আছেন।
- মোশতবা খামেনেই (Mojtaba Khamenei): খামেনেইর ছেলে। অফিশিয়াল কোনো পদ নেই, কিন্তু ক্ষমতা অনেক গভীরে। তাঁর ব্যক্তিগত আক্রোশ কাজ করার সম্ভাবনা প্রবল এবং আইআরজিসি-র বড় একটা অংশের সমর্থন তাঁর দিকে আছে।
- আলিরেজা আরাফি (Alireza Arafi): এই নামটা অনেকে জানেন না। তিনি প্রভিশনাল কাউন্সিলে আছেন এবং খামেনেইর উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে আছেন। তিনি সিস্টেমের জন্য একজন ‘সেফ চয়েজ’। অন্যদিকে মোশতবা তখনই আসবেন, যদি তিনি তাঁর দশকের পর দশক ধরে জমানো গোপন ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেন। আরাফি আসলে বর্তমান স্থিতাবস্থা (status quo) বজায় রাখবেন, বড় কোনো পরিবর্তন আনবেন না।
- পেজেশকিয়ান (Pezeshkian): ইরানের প্রেসিডেন্ট। তিনি প্রভিশনাল কাউন্সিলের অংশ ঠিকই, কিন্তু তাঁর হাতে ক্ষমতা নেই। তিনি কেবল একজন নামমাত্র প্রধান, যার দিকে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কেউ তাকিয়ে নেই।
এখনই একে ‘শেষ’ বলবেন না। সিস্টেম এখনও কাজ করছে। শুধু নাম বদলেছে, আদর্শ নয়। দেখা যাক এটা কতদিন টিকে থাকে।
এই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার জন্য আসলে কী প্রয়োজন?
এখন পর্যন্ত তেমন কিছু দেখছি না। কোনো দলত্যাগ নেই, ফাটল নেই, কেউ শৃঙ্খলার বাইরে যাচ্ছে না। পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সবকিছু আগে থেকে লিখে রাখা চিত্রনাট্য অনুযায়ী চলছে।
আইআরজিসি-র ভেতর বড় কোনো ফাটল ধরবে বলে মনে হয় না। তবে আমি ‘আর্তেশ’ (Artesh)-এর গতিবিধি দেখতে বেশি আগ্রহী। সহজ কথায়, আইআরজিসি হলো শাসকের নিজস্ব বাহিনী, আর আর্তেশ হলো ইরানের জাতীয় সেনাবাহিনী।
আমি অপেক্ষা করছি—কখন কেউ এই সাজানো চিত্রনাট্যের বাইরে গিয়ে কিছু করে।
যারা জিজ্ঞেস করেন কেন ইরানিরা বিদ্রোহ করছে না, তারা আসলে বাস্তবতা বোঝেন না। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে হাজার হাজার ইরানিকে হত্যা করা হয়েছে। ট্রাকে মেশিনগান বসিয়ে, স্নাইপার দিয়ে সাধারণ মানুষকে মারা হয়েছে। বাসিজ বাহিনী ঘরে ঘরে গিয়ে তল্লাশি চালিয়েছে। এমনকি বেসামরিক মানুষ মারার জন্য তারা ইরাকি ও সিরীয় মিলিশিয়া ভাড়া করে এনেছিল। মৃতদেহ ফেরত দেওয়ার জন্য পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়েছে এবং বাবা-মাকে বাধ্য করা হয়েছে বলতে যে—তাদের সন্তানরা সরকারের অনুগত ছিল। এই ভয়াবহ শক্তির বিরুদ্ধে তারা লড়াই করছে।
আর সেই গণহত্যার মূল কারিগর? লারিজানি। যাকে আমি মনে করি আজ আসলে দেশ চালাচ্ছেন।
‘গ্রিন মুভমেন্ট’, ‘হোয়াইট মুভমেন্ট’ কিংবা ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন—প্রতিবারই ইরানিরা রাস্তায় নেমেছে। তারা অকুতোভয়।
সমস্যা হলো, প্রতিটি বিপ্লবের জন্য সিস্টেমে একটি ফাটল দরকার। সেই মুহূর্তটি প্রয়োজন যখন একজন বাসিজ সদস্য অস্ত্র নামিয়ে রাখবে এবং আদেশ মানতে অস্বীকার করবে। ইরানে সেটি এখনও ঘটেনি।
এখন আরেকটি বিষয় কাজ করছে। ইরানিরা বাইরে থেকে আসা হামলাগুলো দেখছে। তারা হিসাব কষছে: যদি বাইরের শক্তিই এই সিস্টেম ভেঙে দেয়, তবে মিছেমিছি রাস্তায় প্রাণ দেওয়ার দরকার কী? ইরানি জনগণের সাহস নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না।
পাহলভী প্রসঙ্গে (Pahlavi (@PahlaviReza)):
বিষয়টি এভাবে ভাবুন। ট্রাম্প পরিবার আজ নির্বাসিত হলো। ৫০ বছর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প মারা গেছেন। ব্যারন ট্রাম্পের বয়স এখন ৭০। তিনি কখনো ব্যবসা করেননি, কোনো অফিস চালাননি, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও ফেরেননি। এখন যদি মানুষ বলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে এনে দেশ চালাতে হবে—তবে সেটা যেমন শোনায়, পাহলভীর বিষয়টিও তেমন।
পাহলভী কৈশোরে ইরান ছেড়েছেন। এখন তাঁর বয়স ৬৫। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন না, ছিলেন তাঁর মৃত বাবা। মানুষ পাহলভী নামটির প্রতি টান অনুভব করে কারণ এটি বিপ্লব-পূর্ব ইরানের একটি রোমান্টিক ছবি ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু ১৯৭৯ সালের সেই ইরান আর ফিরবে না। আর যিনি পরবর্তী অধ্যায়ের নেতৃত্ব দিতে চাইছেন, তাঁর কোনো অভিজ্ঞতাই নেই।
যখন ইরানিরা রাজপথে প্রাণ দিচ্ছিল, তখন তিনি মিয়ামির বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় আড্ডা দিচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় তাঁর টিম থেকে বার্তা দেওয়া হচ্ছিল যেন ইরানিরা রাজপথে নামে। অনেকে মৃত্যুর মুখে পড়েছে… আমার মতে, এটি কোনো নেতার পরিচয় নয়। ইরানিরা একটি বংশপরিচয়ের চেয়ে আরও ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য।
সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি:
সেন্টকম (CENTCOM) কর্মকর্তারা এখন “উইনচেস্টার সিনারিও” শব্দটি ব্যবহার করছেন। সামরিক পরিভাষায় এর অর্থ—আপনার সব গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়া। আমাদের মিসাইল ইন্টারসেপ্টরগুলোর ক্ষেত্রে এটি ঘটার বাস্তব সম্ভাবনা আছে।
ইরানের কৌশল জটিল কিছু নয়। তারা এত বেশি মিসাইল ছুড়বে যেন প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ঢাল খালি হয়ে যায়। তারা এখন সাধারণ মানের মিসাইলগুলো ব্যবহার করছে আর উন্নতগুলো জমিয়ে রাখছে। ১২ দিনের যুদ্ধে তারা তাদের স্বল্পপাল্লার ‘ফাতেহ’ মিসাইল খুব একটা ব্যবহার করেনি। তাদের কাছে এমন হাজার হাজার মিসাইল আছে যেগুলো ইসরায়েলে না পৌঁছালেও, উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম।
চিন্তা করুন—তারা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করবে যতক্ষণ না আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফুরিয়ে যায়। এরপর তারা হাজার হাজার স্বল্পপাল্লার মিসাইল ছুড়বে লক্ষ্যবস্তুগুলোতে, যা পৌঁছাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় নেয়।
আরেকটি বিষয় যা কেউ বলছে না—চীন ইরানকে মিসাইল প্রপেলান্ট সরবরাহ করছে। রাশিয়া তাদের মিসাইল আধুনিকায়নে সাহায্য করছে। এটি এক ধরনের ছায়া যুদ্ধ। চীন বা রাশিয়ার যুদ্ধবিমান সরাসরি আসবে না; তাদের সাহায্য আসবে মিসাইল তৈরির সরঞ্জাম হিসেবে, যাতে ইরান রেকর্ড গতিতে তাদের অস্ত্রভাণ্ডার পূর্ণ করতে পারে।
একটি শেষ চিন্তা: হতে পারে এটি অনেক দূর ভাবা, কিন্তু প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর যা আমরা উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবহার করছি, তা আসলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য কমছে। তাইওয়ান এখন আগের চেয়ে বেশি অরক্ষিত। চীনের জন্য এটি হয়তো ইরানের চেয়ে তাইওয়ান নিয়ে তাদের কৌশলের অংশ।
ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন মিসাইল মজুত রাখতে পারছি না? কেউ কি আমাকে এটা বুঝিয়ে বলবেন?
ইরানে শান্তি ফিরবে কি না জানি না। আমরা শুধু ইরানের জনগণের জন্য প্রার্থণাই করতে পারি।
Feature photo: A woman holds an image of Iran’s Former Supreme Leader Ayatollah Ali Khamenei when protesting against US-Israel strikes on February 28 in Tehran. PHOTO: REUTERS