লিওনেল মেসি – ফুটবলের জাদুকর!
দুই দশক ধরে তার প্রতিপক্ষ সব চেষ্টা করেছে তাকে মাঠে আটকানোর।
কোচ মুরিনহো একটা খাঁচা বানিয়েছিলেন। অন্যরা গোড়ালি ভাঙার চেষ্টা করেছে। ইতালিয়ান কোচরা মিলে একটা কৌশলের নামই দিয়ে ফেলেছিল – “লা গাবিয়া”, মানে খাঁচা।
শুধু এই একটা লোককে ধীর করতে।
কিছুই কাজ করেনি।
লিওনেল মেসিকে কেউ আটকাতে পারে নি।
আর জোসে মুরিনহো, যিনি সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছিলেন, তিনি ২০০৩ সালেই বলে দিয়েছিলেন – মেসি প্রতি বছর আগের বছর থেকে সেরা হইয়ে ফিরে আসে! সেই ভবিষ্যদ্বাণী কতটা সত্যি হয়েছে, সেটা বুঝতে হলে শুরু থেকে যেতে হবে।
রোসারিওর একটা সাধারণ ছেলে
২৪ জুন, ১৯৮৭। আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে একটা ছেলে জন্ম নিল।
পরিবার শুধু গরিব ছিল না। ছিল তার চেয়েও কঠিন কিছু – শ্রমজীবী। বাবা স্টিলের কারখানায় কাজ করেন, মা পার্টটাইম পরিষ্কারের কাজ করেন। আর্জেন্টিনার অর্থনীতি তখন ভেঙে পড়ছে। সেখানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা যায় না সামনের মাস কিভাবে যাবে, সপ্তাহ পার করতে হয় না খেয়ে।
সেই পরিবারে আলো করে একটা ছেলে জন্ম নিলো। ছেলেটার নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
চার বছর বয়সেই সে পাড়ায় বল নিয়ে ছুটত, এমন ছন্দে ফুটবল খেলত যে পাশ দিয়ে যাওয়া বড়রাও থমকে দাঁড়াত। অবাক হয়ে বলত, কে এই ছেলে এত সুন্দর ফুটবল খেলছে!
কিন্তু এই গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ শুরুতে তার বাবা নন। তিনি তার দাদি, সেলিয়া কুচিত্তিনি। তিনিই প্রথম এই ছোট্ট, শান্ত ছেলের মধ্যে কিছু একটা দেখেছিলেন যা আর কেউ দেখেনি। তিনিই তাকে গ্র্যান্ডোলি ক্লাবে প্রথম ট্রেনিংয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
তারপর সেলিয়া মারা গেলেন। কিন্তু তিনি যে হীরে আবিষ্কার করে গিয়েছিলেন তা ভুল ছিলো না।
মেসির বয়স তখন দশ। সেদিন থেকে প্রতিটা গোলের পর মেসি দুই আঙুল আকাশের দিকে তোলে প্রতিটা গোল তার দাদীর জন্য উৎসর্গ করে, এত বছর পরেও!
নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ এবং একটা রোগ
গ্র্যান্ডোলির পর মেসি যোগ দিলেন নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে। ১৯৯৫ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ছয় বছর। সেখানে মেসি শুধু খেলত না, স্থানীয় কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিল। ডেবিউতেই চারটা গোল।
এর মাঝেই ডাক্তাররা ধরলেন তার শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি। শরীর বাড়তে পারছে না। চিকিৎসা না হলে ক্যারিয়ার শেষ। নিজের জীবনটাই বিপন্ন হবে মেসির.
চিকিৎসার খরচ মাসে প্রায় ৯০০ ডলার। আর্জেন্টিনার অর্থনীতি তখন তলায়। পরিবারের পক্ষে ট এই খরচ বহন করা কোনভাবেই সম্ভব নয়।
নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ, যে ক্লাবকে মেসি ভালোবাসত, প্রথমে রাজি হলো মেসির চিকিৎসা খরচ চালানোর। শুরুতে দিলেও তারপর হটাৎ টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিল।
এই অংশটা কেউ তেমন বলে না এখন। ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় মেসির প্রায় বন্ধই হয়ে যাচ্ছিল, কারণ তার নিজের ক্লাব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে বেশি দামি। তার পেছনে খরচ করাটা তাদের লস!
একটা ন্যাপকিনে সই হওয়া চুক্তি সবকিছু বদলে দিল
এরই মধ্যে মেসির জিনিয়াস ফুটবল ট্যালেন্ট বিভিন্ন এজেন্টদের মাধ্যমে, আত্মীয়দের মাধ্যমে খবর গেল বার্সেলোনায়। হ্যাঁ ফুটবলের বিখ্যাত ক্লাব! একটা ট্রায়াল ঠিক হলো, মেসির কারিশমা স্বচক্ষে দেখার।
২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে মেসি বার্সেলোনায় পৌঁছালেন। একটা ট্রায়াল ম্যাচ খেললেন। ছয়টা গোল দিলেন। কোচরা সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে ভুলে গেলেন।
হু ইউজ দ্যাট কিড!
টেকনিক্যাল ডিরেক্টর কার্লেস রেক্সাচ দশ মিনিট দেখলেন, সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু বার্সেলোনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধীর গতির। তাদের অনেক কমিটি আছে, ক্লাবে কাউকে নিতে অনেক সিদ্ধান্ত আছে আর বৈঠক আছে, তেরো বছরের একটা বিদেশি বাচ্চার চিকিৎসার খরচ নিয়ে নানা রকম সংশয় আছে।
এর মাঝে তিন মাস কাটল। মেসির পরিবার প্রায় আশাই ছেড়ে দিচ্ছিল।
শেষে ১৪ ডিসেম্বর, ২০০০ তারিখে চুক্তি হলো। বোর্ডরুমে না, ক্যামেরার সামনে না। বার্সেলোনার একটা ক্যাফেতে, একটা কাগজের ন্যাপকিনে।
ঐতিহাসিক এক ক্লাব ফুটবল চুক্তি হলো একটা কাগজের ন্যাপকিনে।
সেই ন্যাপকিন ২০২৪ সালে নিলামে বিক্রি হয়েছে ৯ লাখ ডলারের বেশিতে। ওয়েটার যেটা ফেলে দিত, সেটা হয়ে উঠেছে আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে দামি কাগজ।
মেসিকে এখন দেখে কি এইসব বিশ্বাস হয়?
লা মাসিয়া এবং মুরিনহোর প্রথম দেখা
বার্সেলোনার একাডেমি লা মাসিয়া। স্প্যানিশে মানে খামারবাড়ি। এখানে যারা আসে তাদের বেশিরভাগ এক বা দুই বছরের মধ্যে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
মেসি এলেন তেরো বছরে। ছোট, চুপচাপ, বিদেশি।
প্রথম ম্যাচে ছয় গোল। প্রথম পুরো মৌসুমে ৩১ ম্যাচে ৩৮ গোল।
১৬ নভেম্বর, ২০০৩। পোর্তোর বিরুদ্ধে বার্সেলোনার একটা প্রীতি ম্যাচে প্রথমবার প্রথম দলের সাথে ডাক পেলেন। বয়স ১৬ বছর ৪ মাস ২৩ দিন।
সেই রাতে পোর্তোর কোচ কে ছিলেন? জোসে মুরিনহো।
মুরিনহো এই কিশোরকে বল ধরতে দেখলেন। কিছু একটা বুঝলেন। প্রকাশ্যে কিছু বললেন না। কিন্তু মাথায় রেখে দিলেন।
রোনালদিনহোর কাঁধে পুরনো রাজা নতুন রাজাকে বহন করলেন
১ মে, ২০০৫। বার্সেলোনা বনাম আলবাসেতে।
মেসি মাঠে নামলেন বদলি হিসেবে। রোনালদিনহো, তখন বিশ্বের সেরা ফুটবলার, বল পেলেন। ওপরে তাকালেন। ডিফেন্সের মাথার ওপর দিয়ে পরিপূর্ণ একটা চিপ দিলেন।
মেসি দৌড়াচ্ছিলেন। বলটা সঠিক কোণে পেলেন। গোলকিপারের মাথার ওপর দিয়ে আলতো করে তুলে দিলেন।
লা লিগায় প্রথম গোল।
সেলিব্রেশনে রোনালদিনহোর বুকে ঝাঁপ দিলেন। রোনালদিনহো তাকে পিঠে তুলে নিলেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটা ক্যামেরা ধরল – পুরনো রাজা নতুন রাজাকে কাঁধে বহন করছেন। কেউ তখন বুঝতে পারেনি এটা আসলে একটা রাজত্বের হস্তান্তর।
মেসির বয়স তখন ছিলো ১৭ বছর ১০ মাস ৭ দিন।
বার্সেলোনার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা।
পেপ গুয়ার্দিওলা এলেন, খেলাটাই বদলে গেল
২০০৮ সালে বার্সেলোনায় নতুন কোচ এলেন। পেপ গুয়ার্দিওলা।
বয়স ৩৭। আগে কখনো সিনিয়র দল কোচ করেননি।
তিনি মেসির সাথে প্রথম বৈঠকে বললেন: “তোমাকে মাঝখান থেকে খেলাব। উইঙ্গার না, স্ট্রাইকার না, একদম নতুন কিছু। ফলস নাইন। তুমি সব জায়গায় থাকবে, আবার কোথাও নির্দিষ্ট না।”
পেপের আগে বার্সেলোনা সাত মৌসুম ধরে সব মিলিয়ে ১০০ গোলের সীমা পার করতে পারেনি। পেপ মেসিকে কেন্দ্রে বসানোর পর বার্সেলোনা টানা ১৩ মৌসুম ১০০-র বেশি গোল করেছে।
চিন্তা করেন একটা মৌসুমেই!
একটা কৌশলগত সিদ্ধান্ত সব বদলে দিল! একজন খেলোয়াড়, ১৩ বছরের ধারা।
২০০৯ সালে বার্সেলোনা একটা ক্যালেন্ডার বছরে ছয়টা ট্রফি জিতল। লা লিগা, কোপা দেল রে, চ্যাম্পিয়নস লিগ, স্প্যানিশ সুপার কাপ, উয়েফা সুপার কাপ, ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ। সেক্সটাপল।
মাথা নষ্ট রে ভাই!
চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। রিও ফার্দিনান্দের মাথার ওপর দিয়ে মেসির হেড গোল।
“সে মাথায় গোল করার মতো লম্বা না” – এটা যারা বলেছিল তাদের জন্য এই গোলটা ছিলো একটা কাব্যিক জবাব।
মুরিনহো খাঁচা বানালেন, মেসি তা ভেঙে বেরিয়ে গেলেন
রিয়াল মাদ্রিদ মুরিনহোকে নিয়োগ দিল। ২০০৩ থেকে মেসিকে পড়তে থাকা এই লোক এখন মেসিকে থামানোর দায়িত্ব পেলেন।
তাঁর নির্দেশ ছিল সহজ: ফাউল করো, চাপে রাখো, পেপেকে ব্যবহার করো। ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যম এই কৌশলের নাম দিল, লা গাবিয়া, খাঁচা।
এপ্রিল ২০১১। চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনাল। বার্নাব্যুতে বার্সেলোনা।
মুরিনহো পুরো প্রেস রুম নিজের মঞ্চ বানিয়ে নিয়েছিলেন। সাংবাদিকদের ধমকেছেন, রেফারিদের অপমান করেছেন। নিজেই বলতেন, প্রেস রুমের বস তিনি।
তারপর ম্যাচ শুরু হলো।
মেসি দুটো গোল করলেন। দ্বিতীয়টায় পাঁচজন মাদ্রিদ ডিফেন্ডারকে পার করে শান্তভাবে গোল। মেসি পরে বলেছেন এটাই তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ।
মুরিনহো বছর পরে মাথা নাড়তেন এই কথা বলতে গিয়ে।
যে সংখ্যাগুলো অবিশ্বাস্য মনে হয়
২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত মেসি যা করেছেন সেটা পরিসংখ্যান না, টাইপো মনে হয়।
২০১২ সালে একটা ক্যালেন্ডার বছরে ৯১ গোল। এর আগে কেউ এটা করেনি, পরেও না। বেশিরভাগ স্ট্রাইকারের কাছে বছরে ৩০ গোল দারুণ মৌসুম।
একটা লা লিগা মৌসুমে ৫০ গোল। স্প্যানিশ লিগ ৮০ বছর ধরে চলছিল, কেউ পারেনি। মেসি পারলেন।
বার্সেলোনায় মোট ৬৭২ গোল, ৩০৩ অ্যাসিস্ট। ১০টা লা লিগা, ৭টা কোপা দেল রে, ৪টা চ্যাম্পিয়নস লিগ।
কিছু মুহূর্ত আলাদা করে বলতে হয়।
২০০৭ সালে কোপা দেল রেতে হেটাফের বিরুদ্ধে গোল। মারাদোনার ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই গোলের হুবহু নকল, ৬০ মিটার, পাঁচজন ডিফেন্ডার পার করে গোল। পরদিন সব আর্জেন্টিনার পত্রিকা এক শিরোনাম: “নতুন মারাদোনা।” বয়স তখন ১৯।
২০১২ সালে বায়ার লেভারকুজেনের বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়নস লিগ নকআউটে একটাই ম্যাচে পাঁচটা গোল। কেউ আগে করেনি, পরেও না।
২০১৫ সালে বায়ার্নের বিরুদ্ধে জেরোম বোয়াটেংকে শরীরের একটা ফেইন্টে এতটাই দিকভ্রান্ত করলেন যে এই জার্মান ডিফেন্ডার মাটিতে পড়ে গেলেন। সেই ক্লিপ ইউটিউবে ১০ কোটি ভিউ পেরিয়েছে। বোয়াটেং নিজের সেই সুনাম আর পুরোপুরি ফিরে পাননি।
২০১৭ সালে বার্নাব্যুতে ৯২তম মিনিটে বার্সেলোনা ৩-২ এগিয়ে। মেসি গোল করলেন। তারপর ৭০ হাজার মাদ্রিদ দর্শকের সামনে জার্সি খুললেন, আকাশের দিকে তুলে ধরলেন। পিঠে ১০ নম্বর। বার্নাব্যু নীরব হয়ে গেল।
আর্জেন্টিনার সেই যন্ত্রণা
বার্সেলোনায় সব পেয়েছেন, কিন্তু একটা ট্রফি নেই – বিশ্বকাপ।
আর্জেন্টিনায় ফুটবল শুধু একটা খেলা না। সেখানে এটা ধর্ম, পরিচয়, ভাষা। আর সেই পরিচয়ের কেন্দ্রে ৬০ বছর ধরে ছিলেন মারাদোনা।
মেসি এলেন, কিন্তু দেশের মানুষ বুঝতে পারছিল না কীভাবে নেবে। বার্সেলোনায় চলে গেছেন তেরো বছরে, স্প্যানিশ উচ্চারণে কথা বলেন, শান্ত ব্যক্তিত্ব, মারাদোনার মতো না একদমই।
আর্জেন্টিনার মিডিয়া বছরের পর বছর তাঁকে পত্রিকায় কাটাছেড়া করেছে। “ক্লাব স্তরে পারেন, জাতীয় দলে পারেন না।” প্রতিটা বিশ্বকাপ যেন তাঁর জন্য একটা অগ্নিপরীক্ষা ছিলো।
২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে ফাইনালে উঠলেন। মারিও গ্যোটজে অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির জন্য গোল দিলেন। মেসি রানার্সআপ মেডেল নিতে যাওয়ার পথে ট্রফির পাশ দিয়ে হাঁটলেন। তাকালেন। হাত দিলেন না।
সেই ছবি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি।
আমার এখনো এই মুহুর্তের কথা মনে আসলে মেসির জন্য মন ভেঙ্গে যায়। কি কষ্টটাই না পেয়েছিলেন হাতের কাছে এসে এভাবে ট্রফি হারানোর।
২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনাল হারলেন, পেনাল্টিতে। ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল হারলেন, পেনাল্টিতে। দ্বিতীয়বার নিজে মিস করলেন।
প্রেস কনফারেন্সে মাইক্রোফোন ধরে বললেন, আমি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিচ্ছি।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে ফিরে আসতে বললেন। স্টেডিয়ামে ব্যানার উঠল, “লিও যেও না।” আর্জেন্টিনার শিশুরা টেলিভিশনে কাঁদল।
মেসি ফিরলেন।
এত মানুষের ভালবাসার কাছে হেরে আবার ফুটবল মাঠে ফিরলেন।
এখন তো অনেক কিছুই বাকি ছিলো যে!
২০২১ সালে মারাকানায় কান্না
জুলাই ১০, ২০২১। রিও ডে জানেইরো। মারাকানা, দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে পবিত্র স্টেডিয়াম। মহামারির কারণে দর্শক নেই।
কোপা আমেরিকার ফাইনাল। আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল।
এঞ্জেল দি মারিয়া গোল করলেন। আর্জেন্টিনা ১-০ জিতল।
৩৪ বছর বয়সে, ২৮ বছরের অপেক্ষার পর, তিনটে হারানো ফাইনালের পর, মেসি প্রথমবার আন্তর্জাতিক ট্রফি পেলেন।
বাঁশি বাজতেই মাঠে বসে পড়লেন মেসি। কাঁদলেন।
তার সতীর্থরা কাঁধে তুলে নিলেন।
সেই টুর্নামেন্টে তিনি গোল্ডেন বল এবং গোল্ডেন বুট দুটোই পেয়েছিলেন। আর্জেন্টিনার ১২টা গোলের ৯টায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু যে মুহূর্তটা তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় ছিল, সেটায় তিনি গোল করেননি। শুধু দাঁড়িয়ে ছিলেন, ট্রফি ধরে, আকাশের দিকে তাকিয়ে।
দাদি সেলিয়া হয়তো দেখছিলেন কোথাও থেকে।
কাতার ২০২২: ফুটবলের সবচেয়ে সিনেমাটিক সমাপ্তি
আর্জেন্টিনা কাতারে গেল ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থেকে। মেসির বয়স ৩৫, হয়তো শেষ বিশ্বকাপ।
প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে ২-১ হার।
আর্জেন্টিনার মিডিয়া আবার বলতে শুরু করল, এইবার শেষ।
পরের ম্যাচে মেক্সিকো। হারলে বিদায়। ৬৪তম মিনিটে কোনো গোল নেই। মেসি বল পেলেন ২৫ গজ দূরে। একটু সেট করলেন। নিচু শট, গোলের কোণায়।
পুরো টুর্নামেন্ট সেই মুহূর্তে ঘুরে গেল।
অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ক্যারিয়ারের হাজারতম ম্যাচে গোল করলেন মেসি। নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে যে অ্যাসিস্ট দিলেন সেটা জ্যামিতির নিয়ম মানে না। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে জোস্কো গ্ভার্দিওলকে, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি কিশোর ডিফেন্ডারকে, একটানা পাঁচবার ড্রিবল করে পার হয়ে গেলেন।
পুরো স্টেডিয়াম হা হয়ে দেখল মেসি ম্যাজিক।
প্রতিটা নকআউট ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ।
তারপর ফাইনাল।
আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স।
৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০। ট্রফি প্রায় খোদাই হওয়া শুরু হয়েছে মনে মনে। তারপর এমবাপে জেগে উঠলেন। ৯৭ সেকেন্ডে দুটো গোল।
অতিরিক্ত সময়ে মেসি দ্বিতীয় গোল করলেন। এমবাপে হ্যাটট্রিক পূরণ করলেন। ৩-৩।
কি টানটান উত্তেজনা ছিলো এই ম্যাচে কি বলব রে ভাই! প্রায় হার্ট এট্যাক হয়ে যাচ্ছিলো আমার।
সবকিছু গড়ালো সেই, পেনাল্টি।
সেই শব্দটা যেটা মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে দশ বছর ধরে ভয় ছিল।
এবার স্ক্রিপ্ট উল্টো গেলো। ফ্রান্স দুটো শট মিস করল। গঞ্জালো মন্তিয়েলের শেষ পেনাল্টি নেটে গেল।
মেসি হাঁটু গেড়ে বসলেন মাঠের মাঝখানে।
পরে যে ছবিটা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি দেখা ছবিগুলোর একটা হলো, কাতারের ঐতিহ্যবাহী বিশত পোশাক গায়ে মেসি, মাথার ওপর বিশ্বকাপের ট্রফি।
বিশ্বকাপ গোলে তাঁর সংখ্যা দাঁড়াল ২১। পেলের চেয়ে একটা বেশি। দুটো আলাদা বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জেতা ইতিহাসে একমাত্র ফুটবলার।
লিওনেল মেসি!
ইন্টার মায়ামি – অবসর নয়, নতুন অধ্যায়
সবাই ভেবেছিল এরপর মেসি অবসর নিয়ে সৌদি আরব চলে যাবেন। ৪০ কোটি ইউরো বার্ষিক অফার ছিল তার কাছে।
ভাববেই না কেনো! কিন্তু তিনি না বললেন।
বার্সেলোনাও চেয়েছিল। না বলে দিলেন!
২০২৩ সালের গ্রীষ্মে মেসি সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাইন করলেন ইন্টার মায়ামিতে। ডেভিড বেকহ্যামের ক্লাব, যারা আগের মৌসুমে ইস্টার্ন কনফারেন্সে সবার নিচে ছিল।
ফুটবল বিশ্ব টিপি কেটে হাসল।
“ছুটিতে চলে গেছেন, মেসি।” অনেক পত্রিকার শিরোনাম ছিলো এমনই।
ইন্টার মিয়ামিতে ডেবিউ ম্যাচে শেষ মিনিটে ফ্রিকিক, উপরের কোণে।
মেসি প্রথম মাসেই ক্লাবকে লিগস কাপ জেতালেন। ইন্টার মায়ামি আগে কখনো কিছু জেতেনি। এই প্রথম জেতার অনুভূতি চিনলো তারা!
২০২৫ সালে ২৮ ম্যাচে ২৯ গোল, ১৯ অ্যাসিস্ট। আবার গোল্ডেন বুট।
প্লেঅফে এনওয়াইসিএফসির বিরুদ্ধে ম্যাচে ক্যারিয়ারের ৪০৫তম অ্যাসিস্ট করলেন মেসি, ফেরেঙ্ক পুসকাসকে পেছনে ফেলে ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টকারী।
এমএলএস কাপ ফাইনালে ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসকে ৩-১ হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন। এমভিপি মেসি।
পরের সপ্তাহে দ্বিতীয়বার রেগুলার সিজন এমভিপি। লিগের ইতিহাসে প্রথমবার কেউ পরপর দুবার এই পুরস্কার পেলেন।
মেসির বয়স তখন ৩৮।
মার্চ ১৮, ২০২৬। ন্যাশভিলের বিরুদ্ধে ক্যারিয়ারের ৯০০তম গোল।
মুরিনহো মেসিকে নিয়ে ঠিকই বলেছিলেন
২০০৩ সালে একটা ষোলো বছরের ছেলেকে বল ধরতে দেখে মুরিনহো মাথায় কিছু একটা রেখে দিয়েছিলেন।
বছরের পর বছর পরে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হতো মেসি সম্পর্কে। বলতেন: “প্রতিটা ম্যাচে মনে হয় আরো ভালো হচ্ছে।”
দুই দশক পরে সেই কথাটা পরিসংখ্যানে প্রমাণিত সত্য।
মেসির শরীর থামেনি। দৃষ্টিভঙ্গি থামেনি। জেতার প্রবৃত্তি থামেনি।
পেপ গুয়ার্দিওলা বলেছিলেন: “মেসি সেরা কারণ সে একজন killer। জেতার সেই প্রবৃত্তি একটুও বয়স পায়নি।”
রোসারিওর সেই ছেলে, যার দাদি তাকে প্রথম বল কিনে দিয়েছিলেন, যার শরীর বাড়তে চাইছিল না, যার ক্যারিয়ার একটা চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে অর্থাভাবে শেষ হয়ে যেতে পারত, যার ক্লাব চুক্তি একটা ক্যাফের ন্যাপকিনে লেখা হয়েছিল –
সে এখনো খেলছে। এখনো নিজের দেশকে বিশ্বকাপে তুলে এনেছে। হাঁটুর বয়সী ফুটবলারদের চেয়ে গোল সংখ্যায় এগিয়ে থাকছে।
মেসি এখনো জিতছে।
২০২৬ সালে, ৩৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলতে নেমে শুরু করেছেন তিন গোলের হ্যাট্রিক দিয়ে!
এখনো, কোনো না কোনোভাবে, লিওনেল মেসি নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।


%20Messi%20Is%20What%20Mourinho%20Warned%20Us%2015%20Years%20Ago%20-%20YouTube.webp)
















